প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কোনো আস্থা নেই বলে সরাসরি মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন যদি আলোচনার টেবিলে আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে পারে, তবেই কেবল তেহরান পুনরায় সংলাপে আগ্রহী হতে পারে। শুক্রবার (১৫ মে, ২০২৬) নয়াদিল্লিতে ব্রিকস (BRICS) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক চলাকালীন সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
হরমুজ প্রণালি বর্তমানে বৈশ্বিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে। আরাগচি এই নৌপথ নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন:
সমন্বয় বাধ্যতামূলক: তেহরানের সাথে যুদ্ধে সরাসরি জড়িত নয়—এমন জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে শর্ত হলো, তাদের অবশ্যই ইরানের নৌবাহিনীর সাথে সমন্বয় করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা: ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহকারী এই নৌপথটি বর্তমানে প্রায় অচল। আরাগচি পরিস্থিতিকে ‘খুবই জটিল’ বলে অভিহিত করেছেন।
যুদ্ধের প্রস্তুতি: আরাগচি বলেন, ইরান কূটনীতিকে সুযোগ দিতে বর্তমানে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখছে, তবে প্রয়োজনে তারা আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি আলোচনা স্থগিত হয়ে গেছে। আরাগচি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা ‘পরস্পরবিরোধী বার্তা’ ইরানের মধ্যে সংশয় তৈরি করেছে। আলোচনার প্রধান বাধা হিসেবে দুটি বিষয় উঠে এসেছে: ১. ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ২. হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নৌ-নিরাপত্তা।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে ইরান ইস্যুতে তাঁর ধৈর্যের সীমা ফুরিয়ে আসছে। তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সাথে একমত হয়েছেন যে ইরানকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে হবে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই সংকট ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক আধিপত্য ও জ্বালানি রাজনীতির এক দীর্ঘ বিবর্তনের সাক্ষী।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও পারস্য উপসাগর (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০০ সালের দিকে হরমুজ প্রণালি মূলত ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তখন এই অঞ্চলটি তেলের চেয়ে ভারতের সাথে যোগাযোগের কৌশলগত পথ হিসেবে বেশি পরিচিত ছিল। ১৯০০ সালের সেই ব্রিটিশ আধিপত্য থেকে ২০২৬ সালের এই ইরানি সার্বভৌমত্বের লড়াই—অঞ্চলটির গুরুত্ব কেবল বেড়েছে।
শীতল যুদ্ধ ও ইরান বিপ্লব (১৯৭৯): ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে হরমুজ প্রণালিকে ইরান একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। ১৯০০ সালের পর থেকে এই প্রথম কোনো আঞ্চলিক শক্তি সরাসরি পশ্চিমা শক্তিকে এই নৌপথে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা অর্জন করে।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব ও ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট: ২০২৪ সালের বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। ভারত ও চীনের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা এবং ২০২৬ সালের মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী ভূমিকা এই প্রণালিকে একটি সম্ভাব্য ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
২০২৬-এর বর্তমান বাস্তবতা: ১৯০০ সালের পাল তোলা নৌকার আমল থেকে ২০২৬ সালের এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের যুগে পৌঁছেও হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জলপথ। আরাগচির বক্তব্য এবং ট্রাম্পের আল্টিমেটাম প্রমাণ করে যে, ২০২৬ সালের এই মে মাসে বিশ্ব অর্থনীতির চাবিকাঠি ইরানের হাতে এক বড় দর কষাকষির হাতিয়ার।
ইতিহাস সাক্ষী, যে দেশ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করে, সেই দেশই বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। ১৯০০ সালের সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল জমানায় পৌঁছে আমরা দেখছি যে, ইরান তার ভৌগোলিক সুবিধাকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে। আব্বাস আরাগচির বক্তব্যের মাধ্যমে তেহরান একটি ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্যের কূটনীতি খেলছে। একদিকে আলোচনার দুয়ার খোলা রাখা, অন্যদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি বজায় রাখা—এটি ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক বাস্তব চিত্র। হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক মন্দা এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
সূত্র: ১. আল আরাবিয়ার প্রতিবেদন ও ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে আব্বাস আরাগচির সাক্ষাৎকার (১৫ মে, ২০২৬)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: বিংশ শতাব্দীতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও নৌ-যুদ্ধের ইতিহাস (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |